Bahasa Indonesia
Alif Lām Mīm.[4] Kitab (Al-Qur`an) ini tidak ada keraguan padanya; petunjuk bagi mereka yang bertakwa,[5] (Yaitu) mereka yang beriman kepada yang gaib, melaksanakan salat, dan menginfakkan[6] sebagian rezeki yang Kami berikan kepada mereka, dan mereka beriman kepada (Al-Qur`an) yang diturunkan kepadamu (Muhammad) dan (kitab-kitab) yang telah diturunkan sebelum engkau,[7] dan mereka yakin akan adanya akhirat. Merekalah yang mendapat petunjuk dari Tuhannya, dan mereka itulah orang-orang yang beruntung. [4] Beberapa surah dalam Al-Qur`an dibuka dengan huruf abjad seperti Alif Lām Mīm, Alif Lām Rā`, dan sebagainya. Makna huruf-huruf itu hanya Allah yang tahu. Ada yang berpendapat bahwa huruf-huruf itu adalah nama surah dan ada pula yang berpendapat bahwa gunanya untuk menarik perhatian, atau untuk mengisyaratkan bahwa Al-Qur`an itu diturunkan dalam bahasa Arab yang tersusun dari huruf-huruf abjad tersebut. [5] Takwa yaitu mengikuti segala perintah Allah dan menjauhi segala larangan-Nya. [6] Pengertian menginfakkan harta di jalan Allah meliputi belanja untuk kepentingan jihad, pembangunan perguruan, rumah sakit, riset ilmiah dan lain-lain. [7] Yang diturunkan kepada Nabi-nabi sebelum Nabi Muhammad -ṣallallāhu 'alaihi wa sallam- ialah: Taurat, Zabur, Injil dan Suḥuf (lembaran-lembaran) yang tidak seperti Kitab.
QuranEnc.com — Indonesian Translation - Ministry of Religious Affairs — Indonesian Ministry of Religious Affairs (Rowwad Translation Center) v1.0.1
Bahasa lain (9)
English
Alif, Lām, Meem.[7] This is the Book about which there is no doubt, a guidance for those conscious of Allāh[8] - Who believe in the unseen, establish prayer,[9] and spend out of what We[10] have provided for them, And who believe in what has been revealed to you, [O Muḥammad], and what was revealed before you, and of the Hereafter they are certain [in faith]. Those are upon [right] guidance from their Lord, and it is those who are the successful. [7] These are among the fourteen opening letters which occur in various combinations at the beginning of twenty-nine sūrahs in the Qur’ān. Although there has been much speculation as to their meaning, it was not, in fact, revealed by Allāh to anyone and is known only to Him. [8] Literally, "those who have taqwā," i.e., who have piety, righteousness, fear and love of Allāh, and who take great care to avoid His displeasure. [9] At its proper times and according to its specified conditions. [10] It is to be noted that the reference of Allāh (Subḥānahu wa taʿālā) to Himself as "We" in many Qur’ānic verses is necessarily understood in the Arabic language to denote grandeur and power, as opposed to the more intimate singular form "I" used in specific instances.
QuranEnc.com — English Translation - Noor International Center — Saheeh International (Noor International Center) v1.1.2
اردو
الم[1] اس کتاب (کے اللہ کی کتاب ہونے) میں کوئی شک نہیں[1] پرہیزگاروں کو راه دکھانے والی ہے۔[2] جو لوگ غیب پر ایمان ﻻتے ہیں[1] اور نماز کو قائم رکھتے ہیں[2] اور ہمارے دیئے ہوئے (مال) میں سے خرچ کرتے ہیں۔[3] اور جو لوگ ایمان ﻻتے ہیں اس پر جو آپ کی طرف اتارا گیا اور جو آپ سے پہلے اتارا گیا[1] ، اور وه آخرت پر بھی یقین رکھتے ہیں۔ یہی لوگ اپنے رب کی طرف سے ہدایت پر ہیں اور یہی لوگ فلاح اور نجات پانے والے ہیں۔[1] [1] انہیں حروف مقطعات کہا جاتا ہے، یعنی علیحدہ علیحدہ پڑھے جانے والے حروف۔ ان کے معنی کے بارے میں کوئی مستند روایت نہیں ہے۔ واللهُ أَعْلَمُ بِمُرَادِهِ۔ البتہ نبی (صلى الله عليه وسلم) نے یہ ضرور فرمایا ہے کہ ”میں نہیں کہتا کہ «الم» ایک حرف ہے، بلکہ الف ایک حرف، لام ایک حرف اور میم ایک حرف ہے اور ہر حرف پر ایک نیکی اور ایک نیکی کا اجر دس گنا ہے۔“ (سنن ترمذی، کتاب فضائل القرآن، باب ماجاء فیمن قرأ حرفاً) [1] اس کے منزل من اللہ ہونے میں کوئی شبہ نہیں جیسا کہ دوسرے مقام پر ہے: «تَنزِيلُ ٱلۡكِتَٰبِ لَا رَيۡبَ فِيهِ مِن رَّبِّ ٱلۡعَٰلَمِينَ» (السجدة: 2) بعض علما نے کہا ہے کہ یہ خبر بمعنی نہی ہے۔ أَيْ :لا تَرْتَابُوا فِيهِ (اس میں شک نہ کرو)۔ علاوہ ازیں اس میں جو واقعات بیان کئے گئے ہیں، ان کی صداقت میں، جو احکام ومسائل بیان کئے گئے ہیں، ان سے انسانیت کی فلاح ونجات وابستہ ہونے میں اور جو عقائد (توحید ورسالت اور معاد کے بارے میں) بیان کئے گئے ہیں، ان کے برحق ہونے میں کوئی شک نہیں۔ [2] ویسے تو یہ کتاب الٰہی تمام انسانوں کی ہدایت و رہنمائی کے لئے نازل ہوئی ہے، لیکن اس چشمۂ فیض سے سیراب صرف وہی لوگ ہوں گے، جو آب حیات کے متلاشی اور خوف الٰہی سے سرشار ہوں گے۔ جن کے دل میں مرنے کے بعد اللہ کی بارگاہ میں کھڑے ہوکر جواب دہی کا احساس اور اس کی فکر ہی نہیں، جن کے اندر ہدایت کی طلب، یا گمراہی سے بچنے کا جذبہ ہی نہیں ہوگا تو انھیں ہدایت کہاں سے اور کیوں کر حاصل ہوسکتی ہے؟ [1] أُمُورٌ غَيْبِيَّةٌ سے مراد وہ چیزیں ہیں جن کا ادراک عقل وحواس سے ممکن نہیں۔ جیسے ذات باری تعالیٰ، وحی الٰہی، جنت، دوزخ، ملائکہ، عذاب قبر اور حشراجساد وغیرہ۔ اس سے معلوم ہوا کہ اللہ اور رسول (صلى الله عليه وسلم) کی بتلائی ہوئی ماورائے عقل واحساس باتوں پر یقین رکھنا، جزو ایمان ہے اور ان کا انکار کفروضلالت ہے۔ [2] اقامت صلوٰۃ سے مراد پابندی سے اور سنت نبوی کے مطابق نماز کا اہتمام کرنا ہے، ورنہ نماز تو منافقین بھی پڑھتے تھے۔ [3] إِنْفَاقٌ کا لفظ عام ہے، جو صدقات واجبہ اور نافلہ دونوں کو شامل ہے۔ اہل ایمان حسب استطاعت دونوں میں کوتاہی نہیں کرتے، بلکہ ماں باپ اور اہل وعیال پر صحیح طریقے سے خرچ کرنا بھی اس میں داخل ہے اور باعث اجر وثواب ہے۔ [1] پچھلی کتابوں پر ایمان لانے کا مطلب یہ ہے کہ جو کتابیں انبیا (عليهم السلام) پر نازل ہوئیں، وہ سب سچی ہیں، وہ اب اپنی اصلی شکل میں دنیا میں پائی نہیں جاتیں، نیز اب ان پر عمل بھی نہیں کیا جاسکتا۔ اب عمل صرف قرآن اور اس کی تشریح نبوی۔ حدیث۔ پر ہی کیا جائے گا۔ اس سے یہ بھی معلوم ہوا کہ وحی ورسالت کا سلسلہ آنحضرت (صلى الله عليه وسلم) پر ختم کردیا گیا ہے، ورنہ اس پر بھی ایمان لانے کا ذکر اللہ تعالیٰ ضرور فرماتا۔ [1] یہ ان اہل ایمان کا انجام بیان کیا گیا ہے جو ایمان لانے کے بعد تقویٰ وعمل اور عقیدہ صحیحہ کا اہتمام کرتے ہیں۔ محض زبان سے اظہار ایمان کو کافی نہیں سمجھتے۔ کامیابی سے مراد آخرت میں رضائے الٰہی اور اس کی رحمت ومغفرت کا حصول ہے۔ اس کے ساتھ دنیا میں بھی خوش حالی اور سعادت وکامرانی مل جائے تو سبحان اللہ۔ ورنہ اصل کامیابی آخرت ہی کی کامیابی ہے۔ اس کے بعد اللہ تعالیٰ دوسرے گروہ کا تذکرہ فرما رہا ہے جو صرف کافر ہی نہیں، بلکہ اس کا کفر وعناد اس انتہا تک پہنچا ہوا ہے جس کے بعد اس سے خیر اور قبول اسلام کی توقع ہی نہیں۔
QuranEnc.com — Urdu Translation - Muhammad Junagarhi — Muhammad Ibrahim Junagarhi (Rowwad Translation Center) v1.1.3
বাংলা
১. আলিফ- লাম- মিম [১], ২. এটা [১] সে কিতাব যাতে কোনো সন্দেহ নেই [২], মুত্তাকীদের জন্য [৩] হেদায়েত, যারা গায়েবের [১] প্রতি ঈমান আনে [২], সালাত কায়েম করে [৩] এবং তাদেরকে আমরা যা দান করেছি তা থেকে ব্যয় করে [৪]। আর যারা ঈমান আনে তাতে যা আপনার উপর নাযিল করা হয়েছে এবং যা আপনার পূর্বে নাযিল করা হয়েছে [১], আর যারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাসী [২]। তারাই তাদের রবের নির্দেশিত হিদায়াতের উপর রয়েছে এবং তারাই সফলকাম[১]। <b> সূরা আল-বাকারাহ্র গুরুত্ব ও ফযীলত: </b> [১] সূরাটি সবচেয়ে বড় সূরা। [২] সূরাটি সবচেয়ে বেশী আহকাম বা বিধি-বিধান সমৃদ্ধ। [ইবনে কাসীর] [৩] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সূরা পাঠ করার বিভিন্ন ফযীলত বর্ণনা করেছেন: আবু উমামাহ্ আল-বাহেলী রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, “তোমরা কুরআন তিলাওয়াত কর; কেননা, কেয়ামতের দিন এই কুরআন তোমাদের জন্য সুপারিশকারী হিসেবে আসবে। তোমরা দু’টি পুস্প তথা সূরা আল-বাকারাহ ও সূরা আলে-ইমরান তিলাওয়াত কর। কেননা কেয়ামতের দিন এ দু’টি সূরা এমনভাবে আসবে যেন এ দু'টি হচ্ছে দু’খণ্ড মেঘমালা, অথবা দু’টুকরো কালো ছায়া, অথবা দু’ঝাঁক উড়ন্ত পাখি। এ দু’টি সূরা যারা তিলাওাত করবে তাদের থেকে (জাহান্নামের ‘আযাবকে) প্রতিরোধ করবে। তোমরা সূরা আল-বাকারাহ্ তিলাওয়াত কর। কেননা এর নিয়মিত তিলাওয়াত হচ্ছে বারাকাহ্ বা সমৃদ্ধি এবং এর তিলাওয়াত বর্জন হচ্ছে আফসোসের কারণ। আর যাদুকররা এর উপর কোনো প্রভাব বিস্তার করতে পারে না।” [মুসলিম ৮০৪] অপর হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “তোমরা সূরা আল-বাকারাহ্ পাঠ কর। কেননা এর পাঠে বরকত লাভ হয় এবং পাঠ না করা অনুতাপ ও দুর্ভাগ্যের কারণ। যে ব্যক্তি এ সূরা পাঠ করে তার উপর কোনো আহ্লে বাতিল তথা যাদুকরের যাদু কখনও প্রভাব বিস্তার করতে পারেনা। [মুসনাদে আহমাদ ৫/২৪৯] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো বলেন, “তোমরা তোমাদের ঘরসমূহকে কবর বানিও না। নিশ্চয়ই শয়তান ঐ ঘর থেকে পালিয়ে যায় যে ঘরে সূরা আল-বাকারাহ্ পাঠ করা হয়।” [মুসলিম ৭৮০] অন্য বর্ণনায় এসেছে, “যে ঘরে সূরা আল-বাকারাহ্ পড়া হয় সেখানে শয়তান প্রবেশ করেনা।” [মুসনাদে আহমাদ ২/২৮৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “প্রত্যেক বস্তুরই উচ্চ স্তম্ভ রয়েছে, কুরআনের সুউচ্চ শৃংগ হলো সূরা আল-বাকারাহ্।” [তিরমিযী ২৮৭৮, মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৫৯] [৪] রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম হুনাইনের যুদ্ধের দিন সাহাবায়ে কেরামকে ডাকার সময় বলেছিলেন, “হে সূরা আল-বাকারাহ্র বাহক (জ্ঞানসম্পন্ন) লোকেরা।” [মুসনাদে আহমাদ ১/২১৮] ৫) সূরা আল-বাকারাহ্ তিলাওয়াত করলে সেখানে ফিরিশতাগণ আলোকবর্তিকার মত অবতরণ করে। এ প্রসংগে বিভিন্ন সহীহ হাদীসে বর্ণনা এসেছে। [বুখারী ৫০১৮, মুসলিম ৭৯৬] ৬) যে সকল সাহাবায়ে কেরাম সূরা আল-বাকারাহ জানতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে নেতৃত্বের যোগ্যতাসম্পন্ন মনে করতেন এবং তাদেরকে যুদ্ধে আমীর বানাতেন। [তিরমিযী ২৮৭৬; সহীহ ইবনে খুযাইমাহ:৩/৫, হাদীস নং ১৫০৯, ৪/১৪০, হাদীস নং ২৫৪০; মুস্তাদরাকে হাকিম ১/৬১১, হাদীস নং ১৬২২] ৭) অনুরূপভাবে যারা সূরা আল-বাকারাহ এবং সূরা আলে-ইমরান জানতেন, সাহাবায়ে কেরামের নিকট তাদের মর্যাদা ছিল অনেক বেশী। [মুসনাদে আহমাদ ৩/১২০, ১২১] ৮) সর্বোপরি এ সূরাতে আল্লাহ্র “ইসমে ‘আযম” রয়েছে যার দ্বারা দো’আ করলে আল্লাহ্ সাড়া দেন। এ সূরায় এমন একটি আয়াত রয়েছে যা কুরআনের সর্বশ্রেষ্ঠ আয়াত। এ আয়াতটি হচ্ছে আয়াতুল কুরসী, যাতে মহান আল্লাহ্ তা'আলার নাম ও গুণাবলী বর্ণিত হয়েছে। রহমান, রহীম আল্লাহ্র নামে <b> আলিফ্—লাম—মীম [১], </b> [১] আলিফ, লাম, মীম: এ হরফগুলোকে কুরআনের পরিভাষায় ‘হরূফে মুকাত্তা'আত' বলা হয়। ঊনত্রিশটি সূরার প্রারম্ভে এ ধরনের হরূফে মুকাত্তা’আত ব্যবহার করা হয়েছে। এগুলোর সংখ্যা ১৪টি। একত্র করলে দাঁড়ায়: (نَصٌّ حَكِيْمٌ قَاطِعٌ لهُ سِرٌّ) "প্রাজ্ঞ সত্বার পক্ষ থেকে অকাট্য বাণী যাতে তার কোন গোপন ভেদ রয়েছে।" মূলতঃ এগুলো কতগুলো বিচ্ছিন্ন বর্ণ দ্বারা গঠিত এক-একটা বাক্য, যথা—(الّمص ـ حم ـ الّم) । এ অক্ষরগুলোর প্রত্যেকটিকে পৃথক পৃথকভাবে সাকিন করে পড়া হয়ে থাকে। যথা---(الف ـ لام ـ ميم) (আলিফ্-লাম্-মীম্)। এ বর্ণগুলো তাদের নিকট প্রচলিত ভাষার বর্ণমালা হতে গৃহীত। যা দিয়ে তারা কথা বলে এবং শব্দ তৈরী করে। কিন্তু কি অর্থে এবং এসব আয়াত বর্ণনার কি রহস্য রয়েছে এ ব্যাপারে মুফাস্সিরগণের মধ্যে বিভিন্ন মত রয়েছে। এক্ষেত্রে সর্বমোট প্রসিদ্ধ অভিমত হচ্ছে চারটি: ১) এগুলোর কোন অর্থ নেই, কেবলমাত্র আরবী বর্ণমালার হরফ হিসেবে এগুলো পরিচিত। ২) এগুলোর অর্থ আছে কিনা তা আল্লাহ্ই ভাল জানেন, আমরা এগুলোর অর্থ সম্পর্কে কিছুই জানিনা। আমরা শুধুমাত্র তিলাওয়াত করবো। ৩) এগুলোর নির্দিষ্ট অর্থ রয়েছে। কারণ, কুরআনের কোনো বিষয় বা কোনো আয়াত বা শব্দ অর্থহীনভাবে নাযিল করা হয়নি। কিন্তু এগুলোর অর্থ শুধুমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন। অন্য কেউ এ আয়াতসমূহের অর্থ জানেনা, যদি কেউ এর কোনো অর্থ নিয়ে থাকে তবে তা সম্পূর্ণভাবে ভুল হবে। আমরা শুধু এতটুকু বিশ্বাস করি যে, আল্লাহ্ তা'আলা তার কুরআনের কোনো অংশ বেহুদা নাযিল করেননি। ৪) এগুলো ‘মুতাশাবিহাত’ বা অস্পষ্ট বিষয়াদির অন্তর্ভুক্ত। এ হিসাবে অধিকাংশ সাহাবী, তাবেয়ী ও ওলামার মধ্যে সর্বাধিক প্রচলিত মত হচ্ছে যে, হরূফে মুকাত্তা’আতগুলো এমনি রহস্যপূর্ণ যার প্রকৃত মর্ম ও মাহাত্ম্য একমাত্র আল্লাহ্ তা'আলাই জানেন। কিন্তু ‘মুতাশাবিহাত’ আয়াতসমূহের প্রকৃত অর্থ আল্লাহ্ তা'আলার কাছে থাকলেও গভীর জ্ঞানের অধিকারী আলেমগণ এগুলো থেকে হেদায়াত গ্রহণ করার জন্য এগুলোর বিভিন্ন অর্থ করেছেন। কোনো কোনো তাফসীরকারক এ হরফগুলোকে সংশ্লিষ্ট সূরার নাম বলে অভিহিত করেছেন। আবার কেউ কেউ বলেছেন যে, এগুলো আল্লাহ্র নামের তত্ত্ব বিশেষ। আবার অনেকে এগুলোর স্থানভেদে ভিন্ন ভিন্ন অর্থও করেছেন। যেমন আলেমগণ (الم)– এ আয়াতটি সম্পর্কে নিম্নোক্ত মতামত প্রদান করেছেন: ১) এখানে আলিফ দ্বারা আরবী বর্ণমালার প্রথম বর্ণ যা মুখের শেষাংশ থেকে উচ্চারিত হয়, লাম বর্ণটি মুখের মধ্য ভাগ থেকে, আর মীম বর্ণটি মুখের প্রথম থেকে উচ্চারিত হয়। এ থেকে আল্লাহ্ তা'আলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন যে, এ কুরআনের শব্দগুলো তোমাদের মুখ থেকেই বের হয়, কিন্তু এগুলোর মত কোন বাক্যো আনতে তোমাদের সামর্থ্য নেই। ২) এগুলো হলো শপথ বাক্য। আল্লাহ্ তা'আলা এগুলো দিয়ে শপথ করেছেন। ৩) এগুলো কুরআনের ভূমিকা বা চাবির মত যা দ্বারা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কুরআনকে শুরু করেন। ৪) এগুলো কুরআনের নামসমূহ হতে একটি নাম। ৫) এগুলো আল্লাহ্র নামসমূহের একটি নাম। ৬) এখানে আলিফ দ্বারা (أنا) (আমি) আর লাম দ্বারা আল্লাহ্ এবং মীম দ্বারা (أعْلَمُ) (আমি বেশী জানি), অর্থাৎ আমি আল্লাহ্ এর অর্থ বেশী জানি। [দেখুন: তাফসীর ইবন কাসীর ও আত-তাফসীরুস সহীহ] ৭) আলিফ দ্বারা আল্লাহ্, লাম দ্বারা জিবরীল, আর মীম দ্বারা মুহাম্মাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বোঝানো হয়েছে। [দেখুন: তাফসীর ফাতহুল কাদীর ও কুরতুবী] ৮) এভাবে এ আয়াতের আরও অনেকগুলো অর্থ করা হয়েছে। তবে আলেমগণ এসব আয়াতের বিভিন্ন অর্থ উল্লেখ করলেও এর কোনো একটিকেও অকাট্যভাবে এগুলোর অর্থ হিসেবে গ্রহণ করেননি। এগুলো উল্লেখের একমাত্র কারণ আরবদেরকে অনুরূপ রচনার ক্ষেত্রে অক্ষম ও অপারগ করে দেয়া। কারণ এ বর্ণগুলো তাদের ব্যবহৃত ভাষার বর্ণমালা এবং তারা যা দিয়ে কথা বলে থাকে ও শব্দ তৈরী করে থাকে তা থেকে নেয়া হয়েছে। ৯) মোটকথা, এ শব্দ দ্বারা আমরা বিভিন্ন অর্থ গ্রহণের মাধ্যমে হেদায়াতের আলো লাভ করতে পারি, যদিও এর মধ্যকার কোন্ অর্থ আল্লাহ্ তা'আলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন তা সুনির্দিষ্টভাবে আমরা জানি না। তবে এ কথা সুস্পষ্ট যে, কুরআন থেকে হিদায়াত লাভ করা এ শব্দগুলোর অর্থ বুঝার উপর নির্ভরশীল নয়, অথবা এ হরফগুলোর মানে না বুঝলে কোনো ব্যক্তির সরল-সোজা পথ লাভের মধ্যে গলদ থেকে যাবে এমন কোনো কথাও নেই। তাই এর অর্থ নিয়ে ব্যাকুল হয়ে অনুসন্ধান করার এতবেশী প্রয়োজনও নেই। [১] এখানে (ذلك) শব্দের অর্থ - ঐটা, সাধারণতঃ কোনো দূরবতী বস্তুকে ইশারা করার জন্য ব্যবহৃত হয়। এখানে (ذلك) দ্বারা কি উদ্দেশ্য নেয়া হয়েছে এ ব্যাপারে আলেমগণ থেকে কয়েকটি মত বর্ণিত হয়েছে: ১) (ذلك) শব্দের অর্থ তাওরাত ও ইঞ্জিল বুঝানো হয়েছে, তখন তার অর্থ হবে, হে মুহাম্মাদ! (রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম) ঐ কিতাব যা আমি তাওরাত ও ইঞ্জিলে উল্লেখ করেছিলাম, তা-ই আপনার উপর নাযিল করেছি। অথবা হে ইয়াহুদী ও নাসারা সম্প্রদায়! তোমাদেরকে যে কিতাবের ওয়াদা আমি তোমাদের কিতাবে করেছি সেটা এই কিতাব যা আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের উপর নাযিল করেছি। ২) এখানে (ذلك) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এ আয়াতসমূহের পূর্বে মক্কা ও মদীনায় নাযিল কুরআনের অন্যান্য সূরা ও আয়াতের দিকে ইঙ্গিত করা। আর যেহেতু সেগুলো আগেই গত হয়েছে, সেহেতু (ذلك) দ্বারা সম্বোধন শুদ্ধ হয়েছে। ৩) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এখানে কিতাব বলতে ঐ কিতাবকে বুঝিয়েছেন যা আল্লাহ্ তা'আলা তাঁর কাছে রেখে দিয়েছেন এবং যা লাওহে মাহফুজে সংরক্ষিত। ৪) এখানে কিতাব দ্বারা ঐ কিতাব উদ্দেশ্য যাতে আল্লাহ্ তা'আলা বান্দার ভালো-মন্দ, রিযিক, আয়ু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। ৫) এখানে ঐ কিতাব বুঝানো হয়েছে যা তিনি নিজে লিখে রেখেছেন তাঁর কাছে ‘আরশের উপর, যেখানে লেখা আছে, “আমার রহমত আমার ক্রোধের উপর প্রাধান্য পাবে।” [বুখারী ৭৫৫৩, মুসলিম ২৭৫১] ৬) (الم) দ্বারা যদি পবিত্র কুরআন বুঝানো হয়ে থাকে, অর্থাৎ (الم) কুরআনের নাম হয়ে থাকে, তাহলে (ذلك الكتاب) দ্বারা (الم) বুঝানো হয়েছে। ৭) এখানে (ذلك) দ্বারা (هذا ) বুঝানো হয়েছে। [আত-তাফসীরুস সহীহ] অর্থাৎ এই কিতাব যার আলোচনা হচ্ছে বা সামনে আসছে। সুতরাং এর দ্বারা কুরআনকেই বুঝানো হয়েছে। আর এ শেষোক্ত মতই সবচেয়ে বেশী বিশুদ্ধ। সুতরাং (الكتاب) দ্বারা কুরআন মাজীদকে বোঝানো হয়েছে। [২] এ আয়াতে উল্লেখিত (ريب) শব্দের অর্থ এমন সন্দেহ যা অস্বস্তিকর। এ আয়াতের বর্ণনায় মুফাসসিরগণ বিভিন্ন মত পোষন করেছেন: ১) এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, এ কুরআন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে নাযিল করা হয়েছে। ২) তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোনো সন্দেহ করো না। [ইবনে কাসীর] ৩) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, এর অর্থ তোমরা এ কুরআনের মধ্যে কোনো সন্দেহে নিপতিত হবে না। অর্থাৎ এর সবকিছু স্পষ্ট। ৪) কোনো কোনো মুফাসসির বলেন, যদি কিতাব দ্বারা ঐ কিতাব উদ্দেশ্য হয়, যাতে আল্লাহ্ তা'আলা সবকিছুর ভালো-মন্দ হওয়া লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন, তাহলে (لا ريب) দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, এতে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন নেই। [৩] ‘মুত্তাকীন’ শব্দটি ‘মুত্তাকী’-এর বহুবচন। মুত্তাকী শব্দের মূল ধাতু ‘তাকওয়া’। তাকওয়া হলো, নিরাপদ থাকা, নিরাপত্তা বিধান করা। শরী’আতের পরিভাষায় তাকওয়া হলো, বান্দা যেন আল্লাহ্র অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করে, আর তা করতে হলে যা করতে হবে তা হলো, তাঁর নির্দেশকে পুরোপুরি মেনে নেয়া, এবং তাঁর নিষেধকৃত বস্তুকে পুরোপুরি ত্যাগ করা। আর মুত্তাকী হলেন, যিনি আল্লাহ্র আদেশকে পুরোপুরি মেনে নিয়ে এবং তাঁর নিষেধ থেকে সম্পূর্ণরূপে দূরে থেকে তাঁর অসন্তুষ্টি ও শাস্তি থেকে বাঁচার জন্য নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেন। [ইবনে কাসীর] বর্ণিত আছে যে, ‘উমার রাদিয়াল্লাহু আনহু উবাই ইবন কা'ব রাদিয়াল্লাহু আনহুকে তাকওয়া সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে তিনি বললেন, আপনি কি কখনো কাঁটাযুক্ত পথে চলেছেন? তিনি বললেন, অবশ্যই। উবাই বললেন, কিভাবে চলেছেন? ‘উমার বললেন, কাপড় গুটিয়ে অত্যন্ত সাবধানে চলেছি। ‘উবাই বললেন, এটাই হলো, তাকওয়া। [ইবনে কাসীর] তবে প্রশ্ন হতে পারে যে, মুত্তাকীগণকে কেন হেদায়াত প্রাপ্তির জন্য নির্দিষ্ট করেছেন? এ ব্যাপারে আলেমগণ বলেন, মূলতঃ মুত্তাকীরাই আল্লাহ্র কুরআন থেকে হেদায়াত লাভ করতে পারেন, অন্যান্য যারা মুত্তাকী নন তারা হেদায়াত লাভ করতে পারেন না। যদিও কুরআন তাদেরকে সঠিক পথের দিশা দেয়। আর পবিত্র কুরআনের বিভিন্ন আয়াত এ অর্থের উপর প্রমাণবহ। আল্লাহ্ বলেন, “নিশ্চয় এ কুরআন হিদায়াত করে সে পথের দিকে যা আকওয়াম তথা সুদৃঢ় এবং সৎকর্মপরায়ণ মু’মিনদেরকে সুসংবাদ দেয় যে, তাদের জন্য রয়েছে মহাপুরস্কার।” [সূরা আল-ইসরা ৯] ইবন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহুমা এ আয়াতের তাফসীরে বলেন, এ কুরআন তাদের জন্য হিদায়াত যারা হেদায়াত চেনার পর তা গ্রহণ না করার শাস্তির ভয়ে সদা কম্পমান। আর তারা তাঁর কাছ থেকে যা এসেছে তার সত্যায়নের মাধ্যমে রহমতের আশাবাদী। [তাফসীরে ইবনে কাসীর ও আত-তাফসীরুস সহীহ] তাছাড়া হিদায়াতের কোনো শেষ নেই, মুত্তাকীগণ সর্বদা আল্লাহ্র নাযিল করা হেদায়াতের মুখাপেক্ষী বিধায় হেদায়াতকে তাদের জন্য সুনির্দিষ্ট করা হয়েছে। তবে অন্যান্য আয়াতে কুরআনকে সমস্ত মানবজাতির জন্য হেদায়াতকারী বলে উল্লেখ করেছেন, সেখানে এর অর্থ হলো, হিদায়াতের পথ তাদের দেখাতে পারে যদি তারা তা থেকে হিদায়াত নিতে চায়। [১] (غيب)- এর অর্থ হচ্ছে এমনসব বস্তু যা বাহ্যিকভাবে মানবকুলের জ্ঞানের উর্ধ্বে এবং যা মানুষ পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের দ্বারা অনুভব করতে পারে না, চক্ষু দ্বারা দেখতে পায় না, কান দ্বারা শুনতে পায় না, নাসিকা দ্বারা ঘ্রাণ নিতে পারে না, জিহ্বা দ্বারা স্বাদ গ্রহণ করতে পারে না, হাত দ্বারা স্পর্শ করতে পারে না, ফলে সে সম্পর্কে জ্ঞান লাভও করতে পারে না। কুরআনে (غيب) শব্দ দ্বারা সে সমস্ত বিষয়কেই বোঝানো হয়েছে যেগুলোর সংবাদ রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম দিয়েছেন এবং মানুষ যে সমস্ত বিষয়ে স্বীয় বুদ্ধিবলে ও ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য অভিজ্ঞতার মাধ্যমে জ্ঞান লাভে সম্পূর্ণ অক্ষম। এখানে (غيب) শব্দ দ্বারা ঈমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেয়া হয়েছে। যার মধ্যে আল্লাহ্র অস্তিত্ব, সত্তা, সিফাত বা গুণাবলী এবং তাকদীর সম্পর্কিত বিষয়সমূহ, জান্নাত-জাহান্নামের অবস্থা, কেয়ামত এবং কেয়ামতে অনুষ্ঠিত হওয়ার ঘটনাসমূহ, ফেরেশ্তাকুল, সমস্ত আসমানী কিতাব, পূর্ববর্তী সকল নবী ও রাসূলের বিস্তারিত বিষয় অন্তর্ভুক্ত যা সূরা আল-বাকারাহ্র (اٰمَنَ الرَّسُوْلُ) আয়াতে দেয়া হয়েছে। এখানে ঈমানের সংক্ষিপ্ত বর্ণনা আর এ সূরারই শেষে ২৮৫ নং আয়াতে ঈমানের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। [২] ঈমান এবং গায়েব। শব্দ দু’টির অর্থ যথার্থভাবে অনুধাবন করলেই ঈমানের পুরোপুরি তাৎপর্য ও সংজ্ঞা হৃদয়ঙ্গম করা সম্ভব হবে। ঈমান শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, ‘কোনো বিষয়ের স্বীকৃতি দেয়া’। ইসলামী শরী’আতের পরিভাষায় ইমান বলতে বুঝায়, কোনো বিষয়ে মুখের স্বীকৃতির মাধ্যমে অন্তরে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা এবং তা কাজে পরিণত করা। এখানে ঈমানের তিনটি দিক তুলে ধরা হয়েছে। প্রথমতঃ অন্তরে অকপট চিত্তে দৃঢ় বিশ্বাস পোষণ করা। দ্বিতীয়তঃ সে বিষয়ের স্বীকৃতি মুখে দেয়া। তৃতীয়তঃ কর্মকাণ্ডে তার বাস্তবায়ন করা। শুধু বিশ্বাসের নামই ঈমান নয়। কেননা খোদ ইব্লিস, ফির’আউন এবং অনেক কাফেরও মনে মনে বিশ্বাস করত। কিন্তু না মানার কারণে তারা ঈমানদারদের অন্তর্ভুক্ত হতে পারেনি। তদ্রুপ শুধু মুখে স্বীকৃতির নামও ঈমান নয়। কারণ, মুনাফেকরা মুখে স্বীকৃতি দিত। বরং ঈমান হচ্ছে জানা ও মানার নাম। বিশ্বাস করা, মুখে স্বীকৃতি দেয়া এবং কার্যে পরিণত করা -এ তিনটির সমষ্টির নাম ঈমান। তাছাড়া ঈমান বাড়ে ও কমে। উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে ঈমান বিল-গায়েব অর্থ এই দাঁড়ায় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে হেদায়াত এবং শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, সে সবগুলোকে আন্তরিকভাবে মেনে নেয়া। তবে শর্ত হচ্ছে যে, সেগুলো রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘‘আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শিক্ষা হিসেবে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হতে হবে। আহ্লে-ইসলামের সংখ্যাগরিষ্ট দল ঈমানের এ সংজ্ঞাই দিয়েছেন। [ইবনে কাসীর] ‘ঈমান বিল গায়েব’ সম্পর্কে আব্দুল্লাহ ইবন মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘গায়েবের বিষয়াদির উপর ঈমান আনার চেয়ে উত্তম ঈমান আর কারও হতে পারে না। তারপর তিনি এ সূরার প্রথম পাঁচটি আয়াত তেলাওয়াত করলেন।’ [মুস্তাদরাকে হাকিম ২/২৬০] অন্য বর্ণনায় এসেছে, আবু উবাইদাহ ইবনুল জাররাহ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমরা ইসলাম গ্রহণ করেছি, আপনার সাথে জিহাদ করেছি, আমাদের থেকে উত্তম কি কেউ আছে? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, “হ্যাঁ, তারা তোমাদের পরে এমন একটি জাতি যারা আমাকে না দেখে আমার উপর ঈমান আনবে। [সুনান দারেমী ২/৩০৮, মুস্তাদরাকে হাকিম ৪/৮৫] মূলতঃ এটি ‘ঈমান বিল গায়েব’ এর একটি উদাহরণ। সাহাবায়ে কেরাম ও তাবে’য়ীন থেকে বিভিন্ন বর্ণনায় ঈমান বিল গায়েবের বিভিন্ন উদাহরন পেশ করা হয়েছে। কেউ বলেছেন, কুরআন। আবার কেউ বলেছেন, জান্নাত ও জাহান্নাম। [আত-তাফসীরুস সহীহ ৯৯] এ সবগুলোই ঈমান বিল-গায়েবের উদাহরণ। ঈমানের ছয়টি রুকন সংক্রান্ত যাবতীয় বিষয় ঈমান বিল-গায়েবের মূল অংশ। [৩] ‘সালাত’-এর শাব্দিক অর্থ হচ্ছে প্রার্থনা বা দো'আ। শরী’আতের পরিভাষায় সে বিশেষ ইবাদাত যা আমাদের নিকট ‘নামায’ হিসেবে পরিচিত। কুরআনুল কারীমে যতবার সালাতের তাকীদ দেয়া হয়েছে - সাধারণত ইকামত' শব্দের দ্বারাই দেয়া হয়েছে। সালাত আদায়ের কথা শুধু দু’এক জায়গায় বলা হয়েছে। এ জন্য ‘ইকামাতুস সালাত’ (সালাত প্রতিষ্ঠা)-এর মর্ম অনুধাবন করা উচিত। ‘ইকামত’ এর শাব্দিক অর্থ সোজা করা, স্থায়ী রাখা। সাধারণত যেসব খুঁটি, দেয়াল বা গাছ প্রভৃতির আশ্রয়ে সোজাভাবে দাঁড়ানো থাকে, সেগুলো স্থায়ী থাকে এবং পড়ে যাওয়ার আশংকা কম থাকে। এজন্য ‘ইকামত' স্থায়ী ও স্থিতিশীল অর্থেও ব্যবহৃত হয়। কুরআন ও সুন্নাহর পরিভাষায় ‘ইকামাতুস সালাত’ অর্থ, নির্ধারিত সময় অনুসারে যাবতীয় শর্ত ও নিয়ম রক্ষা করে সালাত আদায় করা। শুধু সালাত আদায় করাকে ‘ইকামাতুস সালাত’ বলা হয় না। সালাতের যত গুণ, ফলাফল, লাভ ও বরকতের কথা কুরআন হাদীসে বর্ণনা করা হয়েছে, তা সবই ‘ইকামাতুস সালাত’ (সালাত প্রতিষ্ঠা)-এর সাথে সম্পর্কযুক্ত। যেমন, কুরআনুল কারীমে আছে – ‘নিশ্চয়ই সালাত মানুষকে যাবতীয় অশ্লীল ও গৰ্হিত কাজ থেকে বিরত রাখে।’ [সূরা আল-আনকাবুত ৪৫] বস্তুতঃ সালাতের এ ফল ও ক্রিয়ার তখনই প্রকাশ ঘটবে যখন সালাত উপরে বর্ণিত অর্থে প্রতিষ্ঠা করা হবে। এ জন্য অনেক সালাত আদায়কারীকে অশ্লীল ও নেক্কারজনক কাজে জড়িত দেখে এ আয়াতের মর্ম সম্পর্কে সন্দেহ পোষণ করা ঠিক হবে না। কেননা তারা সালাত আদায় করেছে বটে, কিন্তু প্রতিষ্ঠা করেনি। সুতরাং সালাতকে সকল দিক দিয়ে ঠিক করাকে প্রতিষ্ঠা করা বলা হবে। ‘ইকামত’ অর্থে সালাতে সকল ফরয-ওয়াজিব, সুন্নাত, মুস্তাহাব পরিপূর্ণভাবে আদায় করা, এতে সব সময় সুদৃঢ় থাকা এবং এর ব্যবস্থাপনা সুদৃঢ় করা সবই বোঝায়। তাছাড়া সময়মত আদায় করা। সালাতের রুকু, সাজদাহ, তিলাওয়াত, খুশু-খুযু ঠিক রাখাও এর অন্তর্ভুক্ত। [ইবনে কাসীর] ফরয-ওয়াজিব, সুন্নাত ও নফল প্রভৃতি সকল সালাতের জন্য একই শর্ত। এক কথায় সালাতে অভ্যস্ত হওয়া ও তা শরী’আতের নিয়মানুযায়ী আদায় করা এবং এর সকল নিয়ম-পদ্ধতি যথার্থভাবে পালন করাই ইকামতে সালাত। তন্মধ্যে রয়েছে - জামা‘আতের মাধ্যমে সালাত আদায়ের ব্যবস্থা করা। আর তা বাস্তাবায়নের জন্য সকল ক্ষমতা প্রয়োগ করা। প্রয়োজনে রাষ্ট্রীয়ভাবে তার তদারকির ব্যবস্থা করা। আল্লাহ্ তা'আলা ইসলামী কল্যাণ-রাষ্ট্রের যে রূপরেখা প্রণয়ন করেছেন তার মধ্যে সালাত কায়েম করাকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাসীনদের অন্যতম কর্ম বলে ঘোষণা করে বলেন, “যাদেরকে আমরা যমীনের বুকে প্রতিষ্ঠা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দিবে, সৎকাজের নির্দেশ দিবে এবং অসৎ কাজের নিষেধ করবে।" [সূরা আল-হাজ্জ ৪১] [৪] আল্লাহ্র পথে ব্যয় অর্থে এখানে ফরয যাকাত, ওয়াজিব সদকা এবং নফল দান-সদকা প্রভৃতি যা আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করা হয় সে সবকিছুকেই বোঝানো হয়েছে। [তাফসীর তাবারী] কুরআনে সাধারণত ‘ইনফাক’ নফল দান-সদকার জন্যই ব্যবহৃত হয়েছে। যেখানে ফরয যাকাত উদ্দেশ্য সেসব ক্ষেত্রে ‘যাকাত’ শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে। মুত্তাকীদের গুণাবলী বর্ণনা করতে গিয়ে প্রথমে গায়েবের উপর ঈমান, এরপর সালাত প্রতিষ্ঠা এবং আল্লাহ্র পথে ব্যয় করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। [১] এখানে মুত্তাকীদের এমন আরও কতিপয় গুণের বর্ণনা রয়েছে, যাতে ঈমান বিল-গায়েব এবং আখেরাতের প্রতি বিশ্বাসের প্রসঙ্গটা আরও একটু বিস্তারিতভাবে বর্ণনা করা হয়েছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগে মুমিন ও মুত্তাকী দুই শ্রেণীর লোক বিদ্যমান ছিলেন, এক শ্রেণী তারা যারা প্রথমে মুশরিক ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। অন্য শ্রেণী হলেন যারা প্রথমে আহ্লে-কিতাব ইয়াহুদী-নাসারা ছিলেন এবং পরে ইসলাম গ্রহণ করেছেন। পূর্ববতী আয়াতে প্রথম শ্রেণীর বর্ণনা ছিল। এ আয়াতে দ্বিতীয় শ্রেণীর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাই এ আয়াতে কুরআনের প্রতি ঈমান আনার সাথে সাথে পূর্ববতী আসমানী কিতাবসমূহে বিশ্বাস করার কথাও বলা হয়েছে। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী এ দ্বিতীয় শ্রেণীর লোকেরা যারা ইসলাম গ্রহণের পূর্বে কোনো না কোনো আসমানী কিতাবের অনুসারী ছিলেন, তারা দ্বিগুণ পুণ্যের অধিকারী হবেন। [দেখুন : বুখারী ৩০১১, মুসলিম ১৫৪] প্রথমতঃ কুরআনের প্রতি ঈমান এবং আমলের জন্য, দ্বিতীয়তঃ পূর্ববর্তী কিতাবসমূহে ঈমান আনার জন্য। তবে পার্থক্য এই যে, সেগুলো সম্পর্কে বিশ্বাসের বিষয় হবে, কুরআনের পূর্বে আল্লাহ্ তা'আলা যেসব কিতাব নাযিল করেছেন, সেগুলো সত্য ও হক এবং সে যুগে এর উপর আমল করা ওয়াজিব ছিল। আর এ যুগে কুরআন নাযিল হওয়ার পর যেহেতু অন্যান্য আসমানী কিতাবের হুকুম-আহ্কাম এবং পূর্ববতী শরী‘আতসমূহ মনসুখ হয়ে গেছে, তাই এখন আমল একমাত্র কুরআনের আদেশানুযায়ীই করতে হবে। [ইবনে কাসীর থেকে সংক্ষেপিত] [২] এ আয়াতে মুত্তাকীগণের আরেকটি গুণ বর্ণনা করা হচ্ছে যে, তারা আখেরাতে নিশ্চিত বিশ্বাস বা দৃঢ় প্রত্যয় রাখে। যেসব বিষয়ের প্রতি ঈমান আনা অপরিহার্য সেগুলোর মধ্যে এ বিষয়টি সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া ঈমান অনুযায়ী আমল করার প্রকৃত প্রেরণা এখান থেকেই সৃষ্টি হয়। ইসলামী বিশ্বাসগুলোর মধ্যে আখেরাতের প্রতি ঈমান আনা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিশ্বাস যা দুনিয়ার রূপই পাল্টে দিয়েছে। এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়েই ওহীর অনুসারীগণ প্রথমে নৈতিকতা ও কর্মে এবং পরবর্তীতে ব্যক্তিগত, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে পর্যন্ত দুনিয়ার অন্যান্য জাতির মোকাবেলায় একটি অনন্য বৈশিষ্ট্যপূর্ণ আসনে উত্তীর্ণ হতে সমর্থ হয়েছে। পরন্তু তাওহীদ ও রিসালাতের ন্যায় এ আকীদাও সমস্ত নবী-রাসূলের শিক্ষা ও সর্বপ্রকার ধর্ম-বিশ্বাসের মধ্যেই সর্বসম্মত বিশ্বাসরূপে চলে আসছে। যেসব লোক জীবন ও এর ভোগ-বিলাসকেই জীবনের চরম লক্ষ্য বলে গণ্য করে, জীবনযাত্রার ক্ষেত্রে যে তিক্ত পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়, সে তিক্ততাকেই সর্বাপেক্ষা কষ্ট বলে মনে করে, আখেরাতের জীবন, সেখানকার হিসাব-নিকাশ, শাস্তি ও পুরস্কার প্রভৃতি সম্পর্কে যাদের এতটুকুও আস্থা নেই, তারা যখন সত্য-মিথ্যা কিংবা হালাল-হারামের মধ্যে পার্থক্য করাকে তাদের জীবনের সহজ-স্বাচ্ছন্দ্যের পথে বাধারূপে দেখতে পায়, তখন সামান্য একটু সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের বিনিময়ে সকল মূল্যবোধকে বিসর্জন দিতে এতটুকুও কুণ্ঠাবোধ করে না, এমতাবস্থায় এ সমস্ত লোককে যে কোনো দুস্কর্ম থেকে বিরত রাখার মত আর কোনো কিছুই অবশিষ্ট থাকে না। যা কিছু অন্যায়, অসুন্দর বা অসামাজিক জীবনের শান্তি-শৃংখলার পক্ষে ক্ষতিকর, সেসব অনাচার কার্যকরভাবে উৎখাত করার কোনো শক্তি কোনো আইনেরও নেই, এ কথা পরীক্ষিত সত্য। আইন প্রয়োগের মাধ্যমে কোনো দুরাচারের চরিত্রশুদ্ধি ঘটানোও সম্ভব হয় না। অপরাধ যাদের অভ্যাসে পরিণত হয়ে যায়, আইনের শাস্তি সাধারণত তাদের দাঁত-সওয়া হয়ে পড়ে। শেষ পর্যন্ত আর তাদের মধ্যে শাস্তিকে যারা ভয় করে, তাদের সে ভয়ের আওতাও শুধুমাত্র ততটুকুতেই সীমাবদ্ধ থাকে, যকটুকুতে ধরা পড়ার ভয় বিদ্যমান। কিন্তু গোপনে লোকচক্ষুর অন্তরালে যেখানে ধরা পড়ার সম্ভাবনা থাকে না, সেরূপ পরিবেশে এ সমস্ত লোকের পক্ষেও যে কোনো গৰ্হিত কাজে লিপ্ত হওয়ার পথে কোনো বাধাই থাকে না। প্রকারান্তরে আখেরাতের প্রতি ঈমানই এমন এক কার্যকর নিয়ন্ত্রণবিধি যা মানুষকে প্রকাশ্য-অপ্রকাশ্য সর্বত্রই যে কোনো গৰ্হিত আচরণ থেকে অত্যন্ত কার্যকারভাবে বিরত রাখে। তার অন্তরে এমন এক প্রত্যয়ের অম্লান শিখা অবিরাম সমুজ্জ্বল করে দেয় যে, আমি প্রকাশ্যেই থাকি আর গভীর নির্জনেই থাকি, রাজপথে থাকি কিংবা কোনো বদ্ধঘরে লুকিয়েই থাকি, মুখে বা ভাব-ভঙ্গিতে প্রকাশ করি আর নাই করি, আমার সকল আচরণ, আমার সকল অভিব্যক্তি, এমনকি অন্তরে লুক্বায়িত প্রতিটি আকাংখা পর্যন্ত এক মহাসত্তার সামনে রয়েছে। তাঁর সদাজাগ্রত দৃষ্টির সামনে কোনো কিছুই আড়াল করার সাধ্য আমার নেই। আমার সংগে রয়েছে এমনসব প্রহরী যারা আমার প্রতিটি আচরণ এবং অভিব্যক্তি প্রতিমুহুর্তেই লিপিবদ্ধ করছেন। উপরোক্ত বিশ্বাসের মাধ্যমেই প্রাথমিক যুগে এমন মহোত্তম চরিত্রের অগণিত লোক সৃষ্টি হয়েছিলেন, যাদের চাল-চলন এবং আচার-আচরণ দেখেই মানুষ ইসলামের প্রতি শ্রদ্ধায় অবনত হয়ে পড়ত। এখন লক্ষণীয় আর একটি বিষয় হচ্ছে, আয়াতের শেষে (يُؤمِنُوْنَ) শব্দ ব্যবহার না করে (يُوْقِنُوْنَ) ব্যবহার করা হয়েছে। ইয়াক্বীন অর্থ দৃঢ় প্রত্যয়। যার দ্বারা ইঙ্গিত করা হয়েছে যে, আখেরাতের প্রতি এমন দৃঢ় প্রত্যয় রাখতে হবে, যে প্রত্যয় স্বচক্ষে দেখা কোনো বস্তু সম্পর্কেই হতে পারে। এ দৃঢ় প্রত্যয়ের গুরুত্ব নির্ধারণে আবদুল্লাহ ইবন মাস‘উদ রাদিয়াল্লাহু ‘আনহু বলেন, “সবর হচ্ছে ঈমানের অর্ধেক, আর ইয়াকীন হচ্ছে পূর্ণ ঈমান।” [মুস্তাদরাকে হাকিম ২/৪৪৬] মুত্তাকীদের এই গুণ আখেরাতে আল্লাহ্ তা'আলার সম্মুখে উপস্থিতি এবং হিসাব-নিকাশ, প্রতিদান এবং সবকিছুরই একটি পরিপূর্ণ নকশা তার সামনে দৃশ্যমান করে রাখবে। যে ব্যক্তি অন্যের হক নষ্ট করার জন্য মিথ্যা মামলা করে বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়, আল্লাহ্র আদেশের বিপরীত পথে হারাম ধন-দৌলত উপার্জন করে এবং দুনিয়ার হীন উদ্দেশ্য সফল করার জন্য শরী‘আত বিরোধী কাজ করে, সে ব্যক্তি আখেরাতে বিশ্বাসী হয়ে, প্রকাশ্যে ঈমানের কথা যদি স্বীকার করে এবং শরী’আতের বিচারে তাকে মুমিনও বলা হয়, কিন্তু কুরআন যে ইয়াকীনের কথা ঘোষণা করেছে, এমন লোকের মধ্যে সে ইয়াকীন থাকতে পারে না। আর সে কুরআনী ইয়াকীনই মানবজীবনে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনে দিতে পারে। আর এর পরিণামেই মুত্তাকীগণকে হেদায়াত এবং সফলতার সে পুরস্কার দেয়া হয়েছে, যাতে বলা হয়েছে যে, তারাই সরল-সঠিক পথের পথিক যা তাদের পালনকর্তার পক্ষ থেকে দান করা হয়েছে, আর তারাই সম্পূর্ণ সফলকাম হয়েছে। [১] যারা মুত্তাকী তারাই সফলকাম। এখানে মুত্তাকীদের গুণাগুণ বর্ণনা করার পরে হিদায়াতের জন্য তাদেরকে সুনির্দিষ্ট করে বলা হয়েছে যে, তারাই তাদের রবের দেয়া হিদায়াত পাবে এবং তারাই সফলকাম হবে। আল্লাহ্র এ ঘোষণার প্রেক্ষিতে সৎলোকেরা জান্নাতে স্থান পাবে। বর্তমান জীবনের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি ও অসমৃদ্ধি, সাফল্য ও ব্যর্থতা আসল মানদণ্ড নয়। বরং আল্লাহ্র শেষ বিচারে যে ব্যক্তি উতরে যাবে সে-ই হচ্ছে সফলকাম। আর সেখানে যে উতরাবে না সে ব্যর্থ। সূরা আল-বাকারাহ’র প্রথম পাঁচটি আয়াতে কুরআনকে হিদায়াত বা পথপ্রদর্শনের গ্রন্থরূপে ঘোষণা করে সকল সন্দেহ ও সংশয়ের উর্ধ্বে স্থান দেয়ার পর সে সমস্ত ভাগ্যবান ব্যক্তিদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যারা এ গ্রন্থের হিদায়াতে পরিপূর্ণভাবে উপকৃত ও লাভবান হয়েছেন এবং যাদেরকে কুরআনের পরিভাষায় মুমিন ও মুত্তাকী উপাধিতে ভূষিত করা হয়েছে। তাদের বৈশিষ্ট্য, গুণাবলী এবং পরিচয়ও বর্ণনা করা হয়েছে। পরবর্তী পনেরটি আয়াতে সে সকল লোকের বিষয় আলোচিত হয়েছে, যারা এ হিদায়াতকে অগ্রাহ্য ও অস্বীকার করে বিরুদ্ধাচরণ করেছে। এরা দু’টি দলে বিভক্ত। একদল প্রকাশ্যে কুরআনকে অস্বীকার করে বিরুদ্ধাচারণের পথ অবলম্বন করেছে। কুরআন তাদেরকে কাফের বলে আখ্যায়িত করেছে। অপর দল হচ্ছে, যারা হীন পার্থিব উদ্দেশ্যে অন্তরের ভাব ও বিশ্বাসের কথাটি খোলাখুলিভাবে প্রকাশ করতে সাহস পায়নি, বরং প্রতারণার পথ অবলম্বন করেছে; মুসলিমদের নিকট বলে, আমরা মুসলিম; কুরআনের হিদায়াত মানি এবং আমরা তোমাদের সাথে আছি। অথচ তাদের অন্তরে লুক্কায়িত থাকে কুফর বা অস্বীকৃতি। আবার কাফেরদের নিকট গিয়ে বলে, আমরা তোমাদের দলভুক্ত তোমাদের সাথেই রয়েছি। মুসলিমদের ধোকা দেয়ার জন্য এবং তাদের গোপন কথা জানার জন্যই তাদের সাথে মেলামেশা করি। কুরআন তাদেরকে ‘মুনাফিক' বলে আখ্যায়িত করেছে। এ পনেরটি আয়াত যারা কুরআন অমান্য করে তাদের সম্পর্কে নাযিল হয়েছে। তন্মধ্যে ৬ ও ৭নং আয়াতে যারা প্রকাশ্যে অস্বীকার করে তাদের কথা ও স্বরূপ তুলে ধরা হয়েছে। আর পরবর্তী তেরটি আয়াতই মুনাফেকদের সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এ আয়াতগুলোর বিস্তারিত আলোচনায় মনোনিবেশ করলে বোঝা যায় যে, আল্লাহ্ তা'আলা সূরা আল-বাকারাহ‘র প্রথম বিশটি আয়াতে একদিকে হিদায়াতের উৎসের সন্ধান দিয়ে বলেছেন যে, এর উৎস হচ্ছে তাঁর কিতাব এই কুরআন; অপরদিকে সৃষ্টিজগতকে এ হিদায়াত গ্রহণ করা ও না করার নিরিখে দু’টি ভাগে বিভক্ত করে দিয়েছেন। যারা গ্রহণ করেছে তাদেরকে মু’মিন-মুত্তাকী বলেছেন, আর যারা অগ্রাহ্য করেছে তাদেরকে কাফের ও মুনাফেক বলেছেন। কুরআনের এ শিক্ষা থেকে একটি মৌলিক জ্ঞাতব্য বিষয় এও প্রমাণিত হয় যে, বিশ্ববাসীকে এমনভাবে দু’টি ভাগ করা যায়, যা হবে আদর্শভিত্তিক। বংশ, গোত্র, দেশ, ভাষা ও বর্ণ এবং ভৌগলিক বিভক্তি এমন কোন ভেদরেখা নয়, যার ভিত্তিতে মানবজাতিকে বিভক্ত করা যেতে পারে।
QuranEnc.com — bengali_zakaria — Abu Bakr Zakaria (as published on QuranEnc.com, retrieved 2026-10-18)
Türkçe
Elif, Lâm, Mîm.[1] Hiç kuşkusuz bu kitap, takva sahipleri için yol göstericidir. Onlar gaybe inanırlar, namazı dosdoğru kılarlar, kendilerine rızık olarak verdiğimizden de Allah yolunda harcarlar. Onlar, sana indirilene, senden önce indirilenlere ve ahirete de kesin olarak iman ederler. İşte onlar Rableri katından bir hidayet üzeredir ve kurtuluşa erecek olanlar onlardır. [1] Surelerin başında bulunan (Hurûf-u Mukatta) ayrılmış harfler, Kur'an'ın mucizevi yapısını göstermektedir. Müşrikler Kur'an'a meydan okumuşlar, ancak onu çürütememişlerdir. Zira o (Kur'an), Arapça'yı meydana getiren harflerden oluşmaktadır. Arapların -en belagatli insanlar olmalarına rağmen- ona benzer bir şey ortaya koyamamış olmaları, Kur'an'ın Allah tarafından bir vahiy olduğunu göstermektedir.
QuranEnc.com — Turkish Translation - Rowwad Translation Center — Rowwad Translation Center v1.0.4
فارسی
الم [= الف. لام. میم]. این کتابی است که هیچ تردیدی در [الهی بودنِ] آن نیست و مایۀ هدایت پرهیزگاران است؛ همان کسانی که به غیب ایمان دارند و نماز را برپا میدارند و از آنچه به آنان روزی دادهایم انفاق میکنند؛ و آن کسانی که به آنچه بر تو و [بر پیامبران] پیش از تو نازل شده است ایمان میآورند و به [روز] رستاخیز یقین دارند. اینان از جانب پروردگارشان از هدایت برخوردارند و رستگاران [واقعی] همینها هستند.
QuranEnc.com — Persian Translation - Rowwad Translation Center — Rowwad Translation Center v1.1.3
Français
Alif-Lâm-Mîm.[1] Voici le Livre qui n’admet aucun doute[2] et qui est un guide pour ceux qui craignent le Seigneur[3], qui croient aux mystères[4], accomplissent la prière[5] et offrent par charité[6] une partie de ce que Nous leur avons accordé, qui croient au Livre[7] qui t’a été révélé[8] et aux Ecritures[9] révélées avant toi, et qui ont une foi inébranlable en l’au-delà. Voilà ceux qui sont guidés par leur Seigneur, voilà les bienheureux. [1] Voici le commentaire d’Ibn Kathîr, le plus fameux exégète musulman, au sujet de ces lettres isolées appartenant à l’alphabet arabe et apparaissant au début de vingt-neuf des cent quatorze sourates du Coran : « Certains expliquent que ces lettres sont mentionnées au début de certains chapitres pour démontrer le caractère miraculeux du texte coranique que les hommes sont incapables d’imiter alors qu’il est composé de ces lettres dont ils font pourtant un usage quotidien. » [2] Quant à son origine divine, précisent certains commentateurs. [3] La notion de « Taqwâ » sera, selon le contexte, rendue comme ici par l’expression « craindre le Seigneur », et plus rarement par la formule « se préserver du châtiment » comme au verset 21 de cette même sourate, ou l’expression : « se préserver du péché », comme au verset 183. Seule en effet la crainte d’Allah et de Son châtiment pousse le croyant à se préserver du péché. [4] Qui croient notamment en Allah, en Ses anges, au Jour dernier, au Paradis et à l’Enfer, pourtant inaccessibles au regard. Les « mystères » de l’islam ne sont donc pas ceux du christianisme (Trinité, Incarnation ou Rédemption) qui, pour leur part, sont inaccessibles à la raison. [5] La « Salât », prière rituelle formée notamment de la lecture du Coran en position debout, d’inclinaisons et de prosternations, que les musulmans sont tenus d’effectuer cinq fois par jour. [6] Ou : par obéissance à Allah. [7] Employé seul et avec une majuscule, le terme « Livre » désignera généralement dans cette traduction le livre par excellence, le Coran. [8] Littéralement : qui a été descendu sur toi. Nous traduirons, en général, cette idée de « descente de la Révélation » par le verbe « révéler » et ses dérivés, plutôt que par le verbe « descendre » et ses dérivés. Il est évident, d’ailleurs, que toute révélation est une « descente » puisqu’elle émane d’Allah qui est au Ciel. [9] C’est le terme qui sera employé dans cette traduction pour désigner les Livres révélés aux juifs et aux chrétiens, l’Ancien et le Nouveau Testament, que ce terme désigne l’ensemble de ces livres ou une partie seulement.
QuranEnc.com — French Translation - Rachid Maach — Rachid Maach v1.0.3
Español
1. Álif. Lam. Mim[1]. 2. Este es el Libro del cual no hay duda, es guía para los que son conscientes de Dios y Le temen devocionalmente, 3. los que creen en lo oculto, practican la oración, dan caridad de lo que les he provisto, 4. y creen en lo que te ha sido revelado [¡Oh, Mujámmad!] y en lo que fue revelado [originalmente a los profetas anteriores], y tienen certeza de la existencia de la otra vida. 5. Ésos son los que están en la guía de su Señor y serán los bienaventurados. [1] Éstas son algunas de las catorce letras que aparecen en diversas combinaciones al comienzo de veintinueve capítulos del Corán. Si bien hay muchas interpretaciones en cuanto a su significado, el mismo no fue revelado por Dios y Él sabe más sobre su verdadero significado.
QuranEnc.com — Spanish Translation - Isa Garcia — Muhammad Isa Garcia v1.0.2
Bahasa Melayu
Alif, Laam, Miim. Kitab Al-Quran ini, tidak ada sebarang syak padanya (tentang datangnya dari Allah dan tentang sempurnanya); ia pula menjadi petunjuk bagi orang-orang yang (hendak) bertaqwa; Iaitu orang-orang yang beriman kepada perkara-perkara yang ghaib, dan mendirikan (mengerjakan) sembahyang serta membelanjakan (mendermakan) sebahagian dari rezeki yang Kami berikan kepada mereka. Dan juga orang-orang yang beriman kepada Kitab “Al-Quran” yang diturunkan kepadamu (Wahai Muhammad), dan Kitab-kitab yang diturunkan dahulu daripadamu, serta mereka yakin akan (adanya) hari akhirat (dengan sepenuhnya). Mereka itulah yang tetap mendapat petunjuk dari Tuhan mereka, dan merekalah orang-orang yang berjaya.
QuranEnc.com — malay_basumayyah — Abdullah Basumayyah (as published on QuranEnc.com, retrieved 2026-10-18)
Русский
Алиф. Лям. Мим. Это Писание[2], в котором нет сомнения, — руководство для богобоязненных, которые веруют в сокровенное, выстаивают молитву и расходуют из того, чем Мы их наделили, и которые веруют в то, что было ниспослано тебе, и в то, что было ниспослано до тебя, пребывая в твёрдой убеждённости в Последней жизни. Такие следуют руководству от своего Господа, и именно они — преуспевшие. [2] Под «Писанием» (араб. аль-Китаб) в данном контексте имеется в виду Коран — откровение, ниспосланное Пророку Мухаммаду (мир ему и благословение Аллаха). Выбор эквивалента «Писание» отражает нормативно-сакральный характер понятия аль-Китаб и отличается от более широкого употребления «Писание» применительно к прежним откровениям (Таурат, Инджиль), упоминаемым в Коране.
QuranEnc.com — russian_rwwad — Rowwad Translation Center (as published on QuranEnc.com, retrieved 2026-10-21)